
ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন শুরু আজ থেকে ॥ প্রভাব ফেলেছে ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয় : তপন কুমার সরকার ॥ জিপিএ-৫ ১,৪৫,৯১১ : পাসের হারে শীর্ষে ও শতভাগ পাস বেশি মাদ্রাসা বোর্ডে
অনলাইন ডেস্ক: ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে পরীক্ষা, স্থগিত হওয়া, পুনরায় পরীক্ষার সূচি প্রকাশ এবং আবার কিছু শিক্ষার্থীর দাবির প্রেক্ষিতে বাতিল হয়ে যায় চলতি বছরের এইচএসসি, আলিম ও সমমানের অবশিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষা। এ অবস্থায় যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি, সেগুলোর ফলাফল তৈরি হয়েছে পরীক্ষার্থীদের এসএসসি, দাখিল বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রকাশিত ফলাফলে অনেকের ধারণা ও আশা ছিল পাসের হার অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং কমেছে পাসের হার, শূণ্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। তবে ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাশের হার ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশের হার কমেছে দশমিক ৮৬ শতাংশ। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১১ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে পাশ করেছে ৮ লাখ ৫৪ হাজার ৬৪৪ জন। গড় পাশের হার ৭৫ দশমিক ৫৬। গতবার গড় পাশের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৯। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ শিক্ষার্থী। যা উত্তীর্ণের মোট সংখ্যার ১৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯২ হাজার ৫৯৫ জন শিক্ষার্থী। সেই হিসেবে এবার জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে ৫৩ হাজার ৩১৬ জন। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৭৬ জন, যা গতবার ছিল ৭৮ হাজার ৫২১ জন। ১৩ লাখ ৩১ হাজার ৫৮ জন পরীক্ষার মধ্যে এবার অকৃতকার্য হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৪৯ জন। তাদের কারও এক বিষয়, কারও একাধিক বিষয়ে ফল খারাপ হওয়ায় ধাক্কা লেগেছে সার্বিক ফলে। এছাড়া পরীক্ষায় অনুপস্থিত ও বহিষ্কারের কারণেও ফলাফল ফেল এসেছে অনেকের। গত বছর ফেল করে ৩ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ জন।সারা দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে। বেলা ১১টায় বোর্ড চেয়ারম্যানরা নিজেদের অফিসে বসে ফল ঘোষণা করেন। একই সময়ে অনলাইনে একযোগে ফল প্রকাশিত হয়। বরাবরের মতোই শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি মোবাইল ফোনে এসএমএস করেও উচ্চ মাধ্যমিকের ফল জানা গেছে। কোভিড মহামারির পর গতবছরই প্রথমবার পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণ সময়ে পরীক্ষা হয়েছিল। এ বছর এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় গত ৩০ জুন। তবে বন্যার কারণে সিলেট বোর্ডের পরীক্ষা শুরু হয় ৯ জুলাই। সাতটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার পর বাকিগুলো আর নেওয়া সম্ভব হয়নি ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং সরকার পতনের পরের ঘটনাপ্রবাহের কারণে। সাতটি বিষয়ের পরীক্ষার পর আটকে থাকা বিষয়গুলোর পরীক্ষা যে আর হচ্ছে না, সে সিদ্ধান্ত হয়েছিল গত ২০ আগস্ট। কিন্তু ফল কীভাবে প্রকাশ করা হবে তা ঠিক করতে সময় লেগে যায়। যে সাতটি বিষয়ের পরীক্ষা হয়েছিল, সেগুলোর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি, সেগুলোর ফলাফল তৈরি হয়েছে পরীক্ষার্থীদের এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রকাশিত ফলাফলে অনেকের ধারণা ও আশা ছিল পাশের হার অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এবার সম্মিলিত ১১ বোর্ডের হিসাবে পাশের হারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডে ৯৩ দশমিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে; জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৬১৩ জন। পাশের হারে ৯ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিলেট; আর জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে প্রথমে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৩ হাজার ১৬৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ পাশ করেছে। উত্তীর্ণ ৭১ হাজার ১২ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৯৮ জন। অন্যদিকে ঢাকা বোর্ডে উত্তীর্ণ ২ লাখ ৪৯ হাজার ২৭৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৮ হাজার ৫৪৮ জন। ঢাকা বোর্ডে এবার পাশের হার ৭৯ দশমিক ২১ শতাংশ। পাশের হারে এ বছর শীর্ষে থাকা সিলেট বোর্ডের পরেই রয়েছে বরিশাল বোর্ড। বরিশালে পাশের হার ৮১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষা কোভিড মহামারি আর বন্যার কারণে বিলম্বিত হয়েছিল। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হওয়া সেই পরীক্ষায় ৮৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করে। জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮২ জন। মহামারির কারণে বিলম্বিত হয়েছিল ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষাও। কম বিষয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ; ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন পায় জিপিএ-৫। আর ২০২০ সালে মহামারির কারণে পরীক্ষা হয়নি। জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নে সবাই পাশ করে, জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন। মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় সার্বিকভাবে পাশ করে ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে মোট ৪৭ হাজার ২৮৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়। ২০২০ সালে পরীক্ষা না নিয়ে ফল প্রকাশের অভিজ্ঞতা এবার আংশিক কাজে লেগেছে।পাশের হারে এগিয়ে মাদ্রাসা বোর্ড, পিছিয়ে ময়মনসিংহ: এবার ১১টি বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাশের হার মাদ্রাসা বোর্ডে এবং সবচেয়ে কম ময়মনসিংহ বোর্ডে। আর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের গড় পাশের হার ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা বোর্ডে ৭৯ দশমিক ২১, রাজশাহী বোর্ডে ৮১ দশমিক ২৪, কুমিল্লা বোর্ডে ৭১ দশমিক ১৫, যশোর বোর্ডে ৬৪ দশমিক ২৯, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭০ দশমিক ৩২, বরিশাল বোর্ডে ৮১ দশমিক ৮৫, সিলেট বোর্ডে ৮৫ দশমিক ৩৯, দিনাজপুর বোর্ডে ৭৭ দশমিক ৫৬, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৬৩ দশমিক ২২, মাদ্রাসা বোর্ডে ৯৩ দশমিক ৪০ এবং কারিগরি বোর্ডে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৮২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করেছে।বিদেশের কেন্দ্রে পাশের হার ৯৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ: এবার বিদেশ কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী ছিল ২৮২ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৬৯ জন। অনুত্তীর্ণ ১৩ জন পরীক্ষার্থী। পাশের হার ৯৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বিদেশে কেন্দ্রে আটটি প্রতিষ্ঠান বা কেন্দ্রের মধ্যে শতভাগ উত্তীর্ণ তিনটি।যেভাবে হয়েছে বিষয় ম্যাপিং: বিষয় ম্যাপিং নতুন নয়। এর আগে করোনাকালে পরীক্ষা নিতে না পারায় কিংবা কম বিষয়ে পরীক্ষা নিতে গিয়ে এই বিষয় ম্যাপিং করে ফলাফল প্রকাশ করা হতো। এ জন্য কোনো পরীক্ষার কোন বিষয়ের নম্বর যুক্ত হবে, সে বিষয়ে একটি নীতিমালাও আছে। এবার যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি, সেগুলোর ফলাফল প্রকাশ করা হয় এসএসসি-দাখিল বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে। এ প্রক্রিয়ায় একজন পরীক্ষার্থী এসএসসি-দাখিলে একটি বিষয়ে যত নম্বর পেয়েছিলেন, এইচএসসি-আলিমে সেই বিষয় থাকলে তাতে এসএসসি-দাখিলে প্রাপ্ত পুরো নম্বর বিবেচনায় নেওয়া হবে। আর এসএসসি-দাখিল ও এইচএসসি-আলিমের পরীক্ষায় বিষয়ে ভিন্নতা থাকলে বিষয় ম্যাপিংয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নম্বর বিবেচনা করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন এসএসসি-দাখিলে যে পরীক্ষার্থী বিজ্ঞানে পড়েছিলেন, এইচএসসি-আলিমে হয়তো তিনি ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিক শাখায় পড়েছেন। সে ক্ষেত্রে এসএসসি-দাখিলে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর প্রাপ্ত নম্বর পরীক্ষার্থীর এইচএসসি-আলিমের ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিকের নৈর্বাচনিক বিষয়ের নম্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন শুরু আজ: যেসব পরীক্ষার্থী ফলে অসন্তুষ্ট হয়েছেন তারা ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদনের সুযোগ পাবে। এই আবেদন শুরু হবে আজ বুধবার থেকে, চলবে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত। মঙ্গলবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ড থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ফল বোর্ড চ্যালেঞ্জ আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ টাকা।যে কারণে সাত বিষয়ে বেশি পরীক্ষা হয়নি: এবার এইচএসসি পরীক্ষা সাতটা হওয়ার পর সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন জোড়াল হয়। উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে ১৬ জুলাই রাতেই সারা দেশে স্কুল, কলেজ, পলিটেকনিকসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৮ জুলাইয়ের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে গেলে ১ আগস্ট পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিকের সব পরীক্ষা স্থগিত করে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড সমন্বয় কমিটি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ৪ আগস্ট থেকে পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে সেই পরীক্ষাগুলোও স্থগিত হয়ে যায়। বারবার স্থগিতের পর ১১ আগস্ট থেকে নতুন সূচিতে পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল। কিন্তু সরকার পতনের পর সহিংসতায় বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র পুড়ে গেলে পরীক্ষা ফের স্থগিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরে স্থগিত পরীক্ষাগুলো ১১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেজন্য নতুন সূচিও প্রকাশ করেছিল কর্তৃপক্ষ; কিন্তু পরীক্ষা দিতে অনাগ্রহী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। পরে অন্তর্র্বতী সরকার তা আরো দুই সপ্তাহ পিছিয়ে অর্ধেক প্রশ্নে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ২০ আগস্ট পাঁচ শতাধিক পরীক্ষার্থী পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে ঢুকে পরীক্ষা না দেওয়ার দাবি তোলে। পরে সেদিনই সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়ে বাকি পরীক্ষাগুলো না নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
প্রতিদিনের আলোচিত কন্ঠ: 















